হিতোপদেশ 28:24

যে মা-বাবার ধনসম্পদ চুরি করে ও বলে, “এ তো অন্যায় নয়,” সে তাদেরই অংশীদার, যারা ধ্বংসসাধন করে।

এখানে দুটি পাপের কথা বলা হয়েছে। পিতা বা মাতার কাছ থেকে চুরি করা অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ, কারণ একজন সন্তান তার সমগ্র জীবনের জন্যই তাদের কাছে ঋণী। কিন্তু এমন ভয়াবহ পাপকে তুচ্ছজ্ঞান করা বা উপহাস করা আরও ভয়ঙ্কর। ঈশ্বর এমন বিকৃতমনা মূর্খদের সেই কঠোরতার সঙ্গেই বিচার করবেন, যে কঠোরতায় তিনি হত্যাকারীদের বিচার করেন।

সদাপ্রভু ঈশ্বর আদেশ দিয়েছেন, “তুমি চুরি করিবে না” (যাত্রাপুস্তক 20:15; দ্বিতীয় বিবরণ 5:19)। পরিস্থিতি অনুযায়ী চুরির শাস্তি ছিল একাধিক গুণ ক্ষতিপূরণ প্রদান। যদি কোনো ব্যক্তি সেই ক্ষতিপূরণ দিতে না পারত, তবে ঋণ শোধ করার জন্য তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে কঠোর পরিশ্রম করানো হতো (হিতোপদেশ 6:31; যাত্রাপুস্তক 22:1-4)। আজকের অনেক আধুনিক কারাগারের মতো তাকে কোনো ব্যক্তিগত কক্ষ দেওয়া হতো না, দিনে তিন বেলা ভালো খাবার খাওয়ানো হতো না, কিংবা সারাদিন খেলাধুলা বা অবসর বিনোদনের সুযোগও দেওয়া হতো না।

তবে বাবা বা মায়ের কাছ থেকে চুরি করাটা চুরির একটি অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা।। একজন সন্তান তার পিতা-মাতার কাছে আজীবন ঋণী, কারণ তারা তাকে গর্ভে ধারণ করেছেন, জন্ম দিয়েছেন, লালন-পালন করেছেন, শিক্ষা দিয়েছেন এবং তার প্রয়োজনের ব্যবস্থা করেছেন (1 তীমথিয় 5:4)। এমন কাজ মৃতপ্রায় বিবেক এবং বিকৃত হৃদয়ের পরিচয় বহন করে। এতে পিতা-মাতাকে ভালোবাসা ও সম্মান করার স্বাভাবিক দায়িত্ব প্রত্যাখ্যান করা হয়, আর অকৃতজ্ঞতা অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। এমন নীচ স্বার্থপর লোভে পরিচালিত ব্যক্তি কত দূর পর্যন্ত অধঃপতিত হতে পারে, তার কোনো সীমা থাকে না।

পিতৃপুরুষদের ইতিহাস প্রায়ই ভয়াবহ পাপের এক করুণ কাহিনি। এই হিতোপদেশের আলোকে দেখুন—রাহেল কীভাবে তার পিতার গৃহদেবতাগুলো চুরি করেছিল, সেগুলো তার পিতার অনুসন্ধান থেকে লুকিয়ে রেখেছিল এবং ভানপূর্ণ অজুহাত দিয়ে তাকে প্রতারণা করেছিল (আদিপুস্তক 31:19, 34-35)। তাহলে কি আশ্চর্যের বিষয় যে, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি দ্বিতীয় পুত্রের জন্ম দিতে গিয়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্যে অকালমৃত্যুবরণ করেছিলেন (আদিপুস্তক 35:16-20)?

কিন্তু এই হিতোপদেশে যে অধার্মিক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, সে কেবল পিতা-মাতার কাছ থেকে চুরি করেই সন্তুষ্ট নয়; সে এই অপরাধের গুরুত্বকেও উপহাস করে। সে মনে করে, তার পিতা-মাতার যা কিছু আছে, তা তারই সম্পত্তি; সুতরাং নিজের জন্য তা নিয়ে নিলে তার কোনো অপরাধবোধ থাকা উচিত নয়। তাকে যদি চোর বা ডাকাত বলা হয়, তবে সে অপমানিত বোধ করবে। কিন্তু সদাপ্রভু তাকে একজন দুষ্ট ব্যক্তি হিসেবেই গণ্য করেন এবং সেই অনুযায়ী তার বিচার করবেন (হিতোপদেশ 21:7)।

যদিও কিছু সমাজে পারিবারিক অপরাধকে কেবল “পারিবারিক বিষয়” বলে গুরুত্বহীন মনে করা হয়, তবুও ঈশ্বরের পবিত্র বাক্যে সেগুলো কখনোই হালকাভাবে দেখা হয় না। নীচ প্রকৃতির মানুষ হয়তো যুক্তি দেখাতে পারে যে, এতে বড় কোনো অপরাধ নেই, কারণ সন্তানরাই তো একদিন পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে। তারা কেবল ভবিষ্যতে যা পাবে, তা-ই আগেভাগে নিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু ঈশ্বর এবং শলোমন ন্যায়সঙ্গতভাবেই এই ঘৃণ্য ব্যক্তিকে ধ্বংসকারীর সঙ্গী বলে গণ্য করেছেন।

এই প্রসঙ্গে “ধ্বংসকারী” বলতে কী বোঝানো হয়েছে, এবং পিতা-মাতার কাছ থেকে চুরি করা ব্যক্তিকে তার সঙ্গে তুলনা করার অর্থই বা কী? এখানে “ধ্বংসকারী” বলতে সাধারণ পথের ডাকাত বা গৃহচোর থেকে শুরু করে অগ্নিসংযোগকারী (যে বিদ্বেষবশত অন্যের সম্পত্তি ধ্বংস করে) কিংবা হত্যাকারী (যে বিদ্বেষবশত মানুষের জীবন নষ্ট করে)—যে কাউকেই বোঝাতে পারে। মূল শিক্ষা হলো, পিতা-মাতার কাছ থেকে চুরি করা কোনোভাবেই অপরাধকে হালকা করে না; বরং ঈশ্বর ও মানুষের দৃষ্টিতে সেটিকে আরও গুরুতর করে তোলে।

একজন ব্যক্তি কীভাবে তার পিতা বা মাতার কাছ থেকে চুরি করতে পারে? সে সরাসরি তাদের সম্পদ চুরি করতে পারে—যেমন মায়ের পার্স থেকে টাকা নেওয়া, অথবা বাবার মানিব্যাগ থেকে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে ব্যবহার করা। অনুমতি ছাড়াই সে যন্ত্রপাতি, খাদ্য, গয়না, আসবাবপত্র, ছবি কিংবা আরও অনেক কিছু নিয়ে নিতে পারে। মনিবের কাছ থেকে চুরি করা যদি নিন্দনীয় হয়, তবে পিতা-মাতার কাছ থেকে ছোটখাটো চুরি তো আরও বেশি নিন্দনীয়। (তীত 2:9-10)! প্রত্যেক জ্ঞানী পাঠকের উচিত, এমন কোনো পাপ করে থাকলে তা তার স্বর্গীয় পিতার কাছে স্বীকার করা এবং তার পিতা-মাতাকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া—এমনকি যদি সেই অপরাধ বহু দশক আগেও ঘটে থাকে।

আর কীভাবে একজন ব্যক্তি তার পিতা বা মাতার কাছ থেকে চুরি করতে পারে? সে পরিবারের সম্পদ—যেমন বাড়ি বা গাড়ি—অপব্যবহার করতে পারে। পিতা-মাতা তাকে যে জিনিসগুলো দিয়েছেন, সেগুলোর যথাযথ যত্ন না নিয়ে নষ্ট করতে পারে। ভবিষ্যতের জন্য যে অর্থ তাকে দেওয়া হয়েছে, তা অপচয় করতে পারে। কলেজে পড়াশোনায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরিবর্তে উচ্ছৃঙ্খল ভোগ-বিলাসে সময় কাটাতে পারে। লাগামহীন জীবনযাপনের মাধ্যমে পিতা-মাতার সম্পত্তি নষ্ট করতে পারে। এমন ঋণ করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত তার বাবাকেই পরিশোধ করতে হয়। সময়মতো ঋণ শোধ না করে তার বাবার আর্থিক সুনাম নষ্ট করতে পারে। এমনকি নিজের মূর্খ আচরণের মাধ্যমে তার বাবার সুনাম ও সম্মানও ক্ষুণ্ন করতে পারে।

একজন ব্যক্তি কীভাবে তার পিতা বা মাতার কাছ থেকে চুরি করতে পারে? সে বাড়িতে অলস হয়ে থেকে তার পিতা-মাতার ওপর অতিরিক্ত পরিশ্রম ও ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে। পড়াশোনায় অলসতা করে এমন অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে সময়মতো কোনো উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে না পারায় তার পিতা-মাতাকে বর্তমানেও এবং ভবিষ্যতেও অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। কর্মজীবনেও যদি সে নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা না দেয়, তবে ভবিষ্যতে তাকে এমন আর্থিক বা অন্যান্য সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে, যা অন্য যুবকেরা নিজেদের পরিশ্রমেই অর্জন করে। এগুলো হলো সেই কয়েকটি উপায়, যার মাধ্যমে একজন সন্তান তার পিতা-মাতার সম্পদ ও পরিশ্রম নষ্ট করতে পারে (হিতোপদেশ 19:26)।

একজন ব্যক্তি আর কীভাবে তার পিতা বা মাতার কাছ থেকে চুরি করতে পারে? বার্ধক্যে তাদের যে সম্মান, সেবা ও ভরণপোষণ প্রাপ্য, তা যদি সে না দেয়, তবে সেও তাদের কাছ থেকে চুরি করে। এমন সময়ে কৃপণতা প্রদর্শন করাকে ঈশ্বর খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস অস্বীকার করার সমতুল্য বলে গণ্য করেন, এবং এমন আচরণকে অবিশ্বাসীর আচরণের চেয়েও নিকৃষ্ট বলে ঘোষণা করেন (1 তীমথিয় 5:8)। মিশরে যোষেফ যেভাবে তার পিতা যাকোবের ভরণপোষণ করেছিলেন, সেই মহৎ দৃষ্টান্তই আপনার আদর্শ হোক (আদিপুস্তক 45:9-13; 47:11-12, 27-28)।

যীশুর সময়ে কিছু দুষ্ট ইহুদি তাদের সম্পত্তি মন্দিরে উৎসর্গ করার মানত করত বা উইল করে দিত, যাতে তারা নিজেদের পিতা-মাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়াতে পারে। প্রভু যীশু তাদের এই ভণ্ড ধার্মিকতার তীব্র নিন্দা করেছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন যে, তারা পিতা-মাতাকে সম্মান করার বিষয়ে ঈশ্বরের স্পষ্ট আদেশ লঙ্ঘন করছে (মথি 15:1-9)। যদিও তারা দাবি করত যে তাদের সম্পদ ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করা হয়েছে, তবুও খ্রিষ্টের বিচারে সেই অজুহাতের কোনো মূল্য ছিল না।

ঈশ্বরকে এ ধরনের মূর্খরা উপহাস করতে পারে না! তারা অবশ্যই কঠোর বিচারের সম্মুখীন হবে। “তোমরা ভ্রান্ত হইও না, ঈশ্বরকে পরিহাস করা যায় না; কেননা মনুষ্য যাহা কিছু বুনে তাহাই কাটিবে” (গালাতীয় 6:7)। আবার, “কিন্তু যদি তদ্রূপ না কর, তবে দেখ, তোমরা সদাপ্রভুর নিকটে পাপ করিলে, এবং নিশ্চয় জানিও, তোমাদের পাপ তোমাদিগকে ধরিবে” (গণনা 32:23)। আরও লেখা আছে, “যে চক্ষু আপন পিতাকে পরিহাস করে, নিজ মাতার আজ্ঞা মানিতে অবহেলা করে, উপত্যকার কাকেরা তাহা তুলিয়া লইবে, ঈগল পক্ষীর শাবকগণ তাহা খাইয়া ফেলিবে” (হিতোপদেশ 30:17)। আমেন! স্বর্গে এমন এক ঈশ্বর আছেন, যিনি একগুঁয়ে ও অবাধ্য সন্তানদের খুশি করার জন্য তাদের প্রশ্রয় দেন না।

আমাদের প্রভু যীশু খ্রিষ্ট শৈশবে তাঁর পিতা-মাতার অধীনস্থ ছিলেন (লূক 2:51)। এমনকি ক্রুশে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করার সময়ও তিনি যত্নসহকারে তাঁর মাতার দেখাশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন (যোহন 19:26-27)। তিনি কখনোই তাদের কোনো কিছুর ক্ষতি করেননি বা তাদের কাছ থেকে কিছু আত্মসাৎ করেননি; বরং তাঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছিলেন। প্রত্যেক পাঠকের উচিত এই মহৎ দৃষ্টান্তটি গভীরভাবে বিবেচনা করা এবং নিজের পিতা-মাতার প্রতি একইরূপ আচরণ বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করা।