হিতোপদেশ 11:13

অপবাদকারী গুপ্ত কথা ব্যক্ত করে; কিন্তু যে আত্মায় বিশ্বস্ত, সে কথা গোপন করে।

আপনার সততা বা বিশ্বস্ততা পরীক্ষা করুন। আপনি কি গোপন কথা রক্ষা করতে পারেন? আপনি কি সেই কথা তাদের থেকে লুকিয়ে রাখবেন, যাদের জানার প্রয়োজন নেই? যাঁরা পরনিন্দা বা গুজব রটনা করে, তাঁদের কোন সততা নেই — তাঁদের মধ্যে বিশ্বস্ত আত্মা নেই। যদি তাঁরা অন্যের বিষয়ে কোনো ক্ষতিকর তথ্য জানতে পারে, তবে তাঁরা অবিলম্বে ও সর্বত্র তা প্রচার করে।

ঈশ্বর যে বিষয়টিকে এখানে অপবাদবাহকতা বলেছেন, অতীতে তাকে বলা হতো পরনিন্দা বা গুজব রটনা। আজ তাকে বলা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তথ্য অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন, অথবা বিনোদন সংবাদ। পত্রিকা, টেলিভিশন, তক্তি, এবং ইন্টারনেটের পাতা এসব বিষয়েই পূর্ণ। মানুষ এগুলো আনন্দের সাথে পড়ে; কৌতূহলে শিহরিত হয় শুনে; আরও বিশদ জানতে চায় — বিশেষত যৌন বিষয় হলে। আর তারা অন্যদেরও জানাতে ব্যাকুল থাকে।

যদি কোনো রাষ্ট্রনেতার ব্যক্তিগত জীবন বা পারিবারিক বিষয়ে সামান্যতম গুজব কিংবা অশোভন তথ্য পাওয়া যায়, তাহা অতি দ্রুত ও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং অনন্তকাল তার আলোচনা চলতে থাকে। একই কথা প্রযোজ্য ব্যবসায়ী, ক্রীড়াবিদ, কিংবা যশস্বী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও। তথ্য যত নেতিবাচক, তত বেশি তা প্রচারের আগ্রহ বাড়ে। গোপন বিষয় জানিবার এই অতি আকাঙ্ক্ষা নিজেই এক পাপ এবং এক বিকৃত প্রজন্মের প্রমাণ।

পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, সহকর্মী, এমনকি মণ্ডলীর সদস্যরাও প্রায়ই অন্যের জীবনের নেতিবাচক ঘটনা ছড়িয়ে দিতে ভালোবাসে। তাঁরা বলে, “আপনি কি জানেন তাঁরা বিবাহবিচ্ছিন্ন? আপনি কি তাঁর সর্বশেষ খবর শুনেছেন? আপনি কি বিশ্বাস করতে পারেন তিনি এমন কাজ করেছেন?” এবং তারপর দুষ্ট অধর ও কর্ণ সকলে মিলে আরম্ভ হয় অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সেই নিন্দামূলক আলোচনা, যা আসলে গোপনই থাকা উচিত ছিল।

এই পাপ ঈশ্বরের কাছে ঘৃণ্য, এবং তিনি তাহাকে ঘৃণা করেন। তাঁর পবিত্র স্বভাব জানে যে, অন্যের বিষয়ে ক্ষতিকর সংবাদ প্রচার করা মানে তাদের সুনামকে কলঙ্কিত করা। বাইবেলে “পরচর্চা” শব্দটি নেই; সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে “অপবাদবাহক”, “পরনিন্দাকারী”, “গোপনচর্চাকারী”, এবং “পরপৃষ্ঠে নিন্দাকারী” শব্দগুলি। শলোমন এখানে শিক্ষা দিয়েছেন যে, যাঁদের আত্মা বিশ্বস্ত, তাঁরা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে যা জানেন, তা পুনরুক্তি করেন না।

অপবাদবাহকতা অর্থ অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় প্রচার করা — বিদ্বেষ বা অলস কৌতূহল মেটাবার জন্য। পরনিন্দা সেই একই কাজের নাম। গোপনচর্চা মানে নিঃশব্দে বা গোপনে অপবাদবাহকতা করা। পরপৃষ্ঠে নিন্দা অর্থ কারও অনুপস্থিতিতে তাহার বিরুদ্ধে কথা বলা। ঈশ্বর এই সকল পাপকে কঠোরভাবে নিন্দা করেন (লেবীয়পুস্তক 19:16; রোমীয় 1:29-30; 1 তীমথিয় 5:13)। অন্যের বিষয়ে নেতিবাচক সংবাদ আপনি কীভাবে পরিচালনা করেন, তাতেই আপনার চরিত্র ও প্রজ্ঞা প্রকাশ পায়।

এই চারটি বাইবেলীয় শব্দই এক অর্থ বহন করে — অন্যের সম্বন্ধে এমন সত্য কথা বলা, যা বলা প্রয়োজনীয় নয়। তথ্য সত্য বলেই যে তা নির্দোষ, এমন নয়; বরং সেটি অপবাদ নয়, কারণ অপবাদ হলো মিথ্যা প্রচার। অপবাদবাহকরা নিজেদের ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে বলেন, “আমি তো কেবল সত্য কথাই বলেছি।” কিন্তু এটাই ঠিক সেই কাজ — অপবাদবাহকতা, পরনিন্দা, গোপনচর্চা, এবং পরপৃষ্ঠে নিন্দা। অপবাদ দুইটি পাপ — মিথ্যা বলা এবং মিথ্যা প্রচার করা;

আর অপবাদবাহকতা একটিমাত্র পাপ — ক্ষতিকর সত্য প্রচার করা।

সেই গোপন বিষয়গুলি সত্য বলেই পাপ হ্রাস পায় না। সদাপ্রভু জানেন, আপনি সেই কথা দুটি কারণেই বলেন —বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব অথবা অলস কৌতূহল থেকে। আপনি এর দ্বারা অন্য ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ণ করেন, এবং এর পেছনে কোনো ঈশ্বরসম্মত কারণ থাকে না। শুধু তখনই গোপন তথ্য প্রকাশ ন্যায়সঙ্গত হয়, যখন আপনি তা কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁদের দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করেন।

শারীরিক ধর্ষণ এক ভয়ঙ্কর অপরাধ, এবং তাহার জন্য কঠোর দণ্ড প্রাপ্য। কিন্তু অপবাদবাহকতা বা পরনিন্দা ততটাই ক্ষতিকর হইতে পারে। এটি কোনো মানুষের শরীর লঙ্ঘন না করে তাহার মানহানি করে, তার সুনামের উপরে এমন আঘাত হানে, যার দাগ জীবনভর মুছা যায় না। যেমন শারীরিক আঘাত যন্ত্রণার স্মৃতি বহন করে, তেমনি অপবাদবাহকতা মানুষের জীবনে স্থায়ী কলঙ্ক, যন্ত্রণা ও দুঃখের ছাপ রেখে যায় — কারণ তখন তাকে পূর্বেকার ভুল বা পাপের জন্য বারংবার নিজেকে রক্ষা করতে হয়। আপনি একটু চিন্তা করে দেখুন।

মানবহৃদয় স্বভাবতই প্রবল পাপাচারপূর্ণ —সে অন্যকে নিন্দা বা ক্ষতি করবার জন্য যে কোনো উপায় অবলম্বন করে (যিরমিয় 17:9; রোমীয় 3:13-18)। প্রকৃতিগতভাবে সকল মানুষ পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষী ও পরস্পরকে ঘৃণা করে (তীত 3:3)। অন্যের সুনাম ক্ষুণ্ণ করবার সহজতম উপায় হল —তাহার ব্যক্তিগত বিষয় এমনভাবে প্রচার করা, যা বলার প্রয়োজন নেই। এমনই পাপকেই এই হিতোপদেশ কঠোরভাবে নিন্দা করে।

বিশ্বস্ত ও ধার্মিক ব্যক্তি কখনো অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় প্রচার করে না। তাঁরা যা শুনে, তা গোপন রাখে; অন্য কাউকে তা বলে না। তাঁরা যতদূর সম্ভব অন্যের সুনাম রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকে, তার প্রতি ব্যক্তিগত অনুভূতি যাই থাকুক না কেন। এইরূপ সততা ও বিশ্বস্ততা ঈশ্বর ও মানুষের দৃষ্টিতে একজন মানুষকে মহান করে তোলে।

এই পাপ এক সময় সমাজে সর্বজনীনভাবে নিন্দিত ছিল। বয়োজ্যেষ্ঠেরা নিশ্চয়ই মনে রাখবেন —বাড়ি বা বিদ্যালয়ে “পরনিন্দা” বা “অভিযোগবাহকতা”-র জন্য কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। কিন্তু বর্তমান অধার্মিক প্রজন্মে এই পাপ একেবারে বিস্মৃত হয়েছে। এখন শাস্তির পরিবর্তে পুরস্কার দেওয়া হয় তাদের, যাঁরা অন্যের জীবনের সবচেয়ে লজ্জাজনক সংবাদ, বা নগ্নচিত্র ও ভিডিও সংগ্রহে সফল হন —সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে অপমান করবার জন্য।

প্রিয় পাঠক, আপনার জিহ্বাকে সংযত রাখুন। যে গোপন বিষয় গোপন রাখবার কথা, তা কখনো প্রকাশ করবেন না। তথ্য সত্য কি মিথ্যা, তাতে কিছুই আসে যায় না। যদি সেই বিষয় কর্তৃত্বের সুষ্ঠু প্রয়োগের জন্য আবশ্যক না হয়—তাহলে তা গোপন রাখুন। যদি তা কোনো ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে পারে—তা গোপন রাখুন। যদি তা কারও উন্নতি, প্রশংসা, বা উপকারে না আসে— তাহলে তা চিরদিনের জন্য গোপন রাখুন।

প্রিয় পাঠক, আপনার কর্ণও সংযত রাখুন। যদি কেউ আপনার উপস্থিতিতে অন্যের নিন্দা করে, তাকে কঠোর মুখভঙ্গি বা তিরস্কার দ্বারা বাধা দিন (হিতোপদেশ 25:23; 1 থিষলনীকীয় 5:14)। কারণ যদি মনোযোগী শ্রোতা না থাকত, তবে অপবাদবাহকের ব্যবসা একদিনেই বন্ধ হত (হিতোপদেশ 7:4)। যদি আপনি কোনো নিন্দুককে অনুমতি দেন যাতে সে আপনার মনে অন্যের প্রতি অপবিত্র চিন্তা জন্মায়, তবে আপনি নিজেও তার পাপে সহচর হবেন।

এই পাপ থেকে বিরত থাকা কতটা জরুরি? এই হিতোপদেশ শিক্ষা দেয়—বিশ্বস্ত ব্যক্তি কখনোই এই কাজ করে না। অনন্ত জীবনের একটি প্রমাণই হল—অন্যের বিষয়ে অপবাদ না ছড়ানো (গীতসংহিতা 15:3)। যেহেতু ঈশ্বর এই পাপকে ঘৃণা করেন এবং পবিত্র শাস্ত্রে বারংবার তা উল্লেখ করেন, অতএব প্রত্যেক পিতার কর্তব্য এই শিক্ষা তাঁর সন্তানদের চরিত্রগঠনের অংশ করে দেওয়া (ইফিষীয় 6:4)। মহান পুরুষ ও নারীরা—যাঁরা বিশ্বস্ত ও সততাশীল—তাঁরা সদা অন্যদের সুনাম রক্ষায় যত্নবান থাকে।

প্রভু যিশু খ্রীষ্ট নিজেই বিশ্বস্ত ও সত্যনিষ্ঠ (প্রকাশিত বাক্য 19:11)। তিনিই তাঁর লোকদের পাপ চিরদিনের জন্য বিস্মৃত করেন (ইব্রীয় 8:12)। তিনিই কখনো তা প্রকাশ করেন না, কারণ অপরাধ আচ্ছাদন করাই তাঁর মহিমা (হিতোপদেশ 25:2; গীতসংহিতা 103:10–12)। তদ্রূপ, আপনিও যেন আনন্দের সঙ্গে অন্যদের প্রতি প্রেম করেন, তাঁদের প্রতি সেই একই সহানুভূতি ও প্রতিজ্ঞা প্রদর্শন করেন— যেন তাঁদের সুনাম, সম্মান ও আত্মসম্মান ক্ষতিকর প্রতিবেদনের হাত থেকে রক্ষা পায় (হিতোপদেশ 10:12; 17:9; 1 পিতর 4:8)।