হিতোপদেশের ব্যাখ্যা

কেননা ধার্মিক সাত বার পড়িলেও আবার উঠে; কিন্তু দুষ্টেরা দুর্যোগে নিপাতিত হইবে।

ঈশ্বর ন্যায়বানদের জন্য একটি গোলাপের শয্যার প্রতিশ্রুতি দেননি। প্রকৃতপক্ষে, একজন ন্যায়বান মানুষকে পরিপূর্ণ করার জন্য, সদাপ্রভু প্রায়ই তাঁর জীবনে কষ্টের আগমন ঘটান। যখন দুর্জনেরা এই সকল সমস্যাগুলি দেখে, তখন তারা মনে করে এই ব্যক্তি চিরতরে পতিত হয়েছে; তাঁকে পরাজিত করার আপাত সাফল্যে তারা আত্মতুষ্টিতে মেতে ওঠে। কিন্তু সদাপ্রভু ন্যায়বান ব্যক্তিকে আবার তোলেন, এবং দুর্জনেরা চিরতরে পতিত হয়।

এই প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শলোমন দুর্জনদের সতর্ক করেছিলেন যেন তারা ন্যায়বানদের বিরুদ্ধে কুপরিকল্পনা না করে। তিনি বলেছিলেন, “রে দুষ্ট, তুমি ধার্মিকের নিবাসের বিরুদ্ধে ঘাঁটি বসাইও না, তাহার শয়ন-স্থান নষ্ট করিও না” (নীতিবচন 24:15)। এটি দুর্জন ও ধার্মিকের চিরন্তন সংঘর্ষ। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, দুর্জনেরা যেন ন্যায়বানদের শান্তি বিঘ্নিত করার চিন্তাও না করে। আর ঠিক এই কারণেই পরবর্তী নীতিটি ভয়ানক সতর্কতা প্রদান করে!

ন্যায়বান ব্যক্তি জীবনে দুঃখ-কষ্টে পতিত হলেও, সদাপ্রভু তাঁকে সমস্ত কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন (ইয়োব 5:17-27; গীতসংহিতা 34:19)। যখন ধার্মিকরা তাঁদের ক্লেশের সময় সদাপ্রভুর কাছে চিৎকার করে তখন তিনি তাঁদের প্রত্যেকটি সমস্যা থেকে উদ্ধার করেন (গীতসংহিতা 34:6, 17)। তিনি তাঁদের হাতে ধরে রাখেন, এবং কষ্টের মধ্য থেকে তুলে নেন (গীতসংহিতা 37:24)। কিন্তু এই হিতোপদেশের বিমর্ষতা—অর্থাৎ অনুলিখিত বাক্যাংশ—এই ঘোষণাই করে যে, দুষ্টেরা বিপদে পতিত হবে, এবং তারা কোনরূপে উদ্ধার বা সহায়তা লাভ করবে না।

যোষেফের দুষ্ট ভাইয়েরা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল। তাঁকে দাস হিসেবে মিশরে বিক্রি করে তারা তাঁর বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। তারা ভেবেছিল তারা যোষেফকে চিরতরে দূর করেছে। কিন্তু ধন্য সদাপ্রভু তাঁকে রাজপাটে উত্তোলিত করছিলেন, এবং কয়েক বছরের মধ্যেই তারাই যোষেফের সামনে প্রাণভয়ে মাথা নত করেছিল। সদাপ্রভুর মহিমা হোক!

শয়তান ইয়োবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল। সে সদাপ্রভুর কাছে ইয়োবের শান্ত জীবনে বিঘ্ন ঘটানোর অনুমতি অনুরোধ করেছিল। ঈশ্বর অনুমতি দেন। শয়তান ক্রমে ইয়োবের সমস্ত ধন-সম্পদ, আয়, জমি, পরিবার, এমনকি তাঁর স্বাস্থ্যও কেড়ে নেয়। কিন্তু সদাপ্রভু ইয়োবের হাত ছাড়েননি; তিনি ভুল ভাবনার সংশোধনের জন্য এলিহুকে পাঠান। সদাপ্রভু তাঁকে আবার উত্তোলিত করেন এবং দ্বিগুণ আশীর্বাদ দেন।

দুঃখিনী হান্নার কোনও সন্তান ছিল না। তার স্বামীর আর-এক স্ত্রী, পনিন্না, তাকে বন্ধ্যা হওয়ার জন্য উপহাস করত এবং অত্যাচার করত। এই দুষ্ট নারী হান্নাকে যন্ত্রণা দান করেছিল এবং তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছিল। মনে হচ্ছিল, হান্নার জন্য আর কোনো আশার আলো নেই। কিন্তু সদাপ্রভু তাঁকে আবার ওঠালেন এবং তাঁকে শমূয়েল—ইস্রায়েলের মহান বিচারক ও ভাববাদী—এবং পাশাপাশি আরও পাঁচ জন সন্তান প্রদান করলেন।

দাউদ ভয়ংকররূপে পাপ করেছিল। এই দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে তাঁরই ছিল। তাঁর শত্রুরা তাঁর বিরুদ্ধে গুপ্তভাবে চক্রান্ত করেছিল, এমনকি তাঁর নিজ পুত্র অবশালোম ও আদোনিয়াও। শিমই প্রকাশ্যে তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিল, কারণ সে তাঁকে এক রক্তপিপাসু মানুষ বলে গণ্য করেছিল। কিন্তু সদাপ্রভু দাউদকে ক্ষমা করলেন, তাঁকে আবার তুললেন, এবং তাঁর শত্রুদের নির্মমভাবে ধ্বংস করলেন। সদাপ্রভু দাউদকে আশীর্বাদ করেছিলেন যাতে দাউদ শলোমনের অভিষেক অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করতে পারে এবং ইস্রায়েলের উপর মহা শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

দানিয়েলের শত্রুরা তার বিরুদ্ধে গুপ্তভাবে ষড়যন্ত্র করেছিল। তারা তাঁর পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে ত্রুটি খুঁজেছিল কিন্তু কিছুই পায়নি। তারা দারিয়কে প্রতারণা করে এমন একটি আইন জারী করাল, যা দানিয়েলের ধর্মের বিরুদ্ধে ছিল। দানিয়েল সেই আইন ভাঙলেন এবং তাঁকে সিংহের গহ্বরে নিক্ষেপ করা হল। শত্রুরা উল্লাস করল এবং আত্মতুষ্টিতে আনন্দিত হল। কিন্তু ঈশ্বর দানিয়েলকে আবার তুললেন এবং তাঁর শত্রুদের ভয়াবহ ধ্বংসে নিক্ষেপ করলেন।

ও খ্রিস্টীয় পাঠক! আপনি কি এখনও আপনার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন আছেন? কেউ কি আপনার বিরুদ্ধে গোপনে ষড়যন্ত্র করছে? কেউ কি আপনার বিপদ দেখে আনন্দ করছে? যদি আপনি সৎপথে চলেন, তবে ধন্য সদাপ্রভু অবশ্যই আপনাকে উদ্ধার করবেন, যেমন তিনি উল্লিখিত উপরের এই সকল উদাহরণে করেছিলেন।

দাউদ ঈশ্বরের হৃদয়ের অনুরূপ মানুষ ছিলেন —যিনি খ্রীষ্টের প্রতিচ্ছবি। তিনিই পুরাতন নিয়মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পতনের সম্মুখীন হয়েছিলেন, কিন্তু সদাপ্রভু তাঁকে বারংবার তুলেছিলেন, সাতবার নয়, বহুবার। সদাপ্রভুর প্রতি তাঁর আত্মবিশ্বাস পড়ুন (গীতসংহিতা 3:1-8; 27:1-14; 46:1-11; 118:1-18)।

পৌল খ্রীষ্টের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেরিত ছিলেন, কিন্তু তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃখভোগ করেছিলেন। কিন্তু সদাপ্রভু তাঁকে আবার উত্তোলিত করলেন, এমনকি মৃত্যুর মধ্য থেকেও (প্রেরিত 14:19-22)! তবুও তিনি কখনও হতাশ হননি (2 করিন্থীয় 4:8-9)। তাঁর দুঃখের তালিকা পড়াও কষ্টকর, কিন্তু তিনি তাতেই আনন্দিত ছিলেন (2 করিন্থীয় 11:23 – 12:10)। ঈশ্বরের প্রতি তাঁর বিশ্বাস পড়ুন (2 তিমথিয় 4:16-18; ইব্রীয় 13:5-6)।

শয়তান, ইহুদীরা, রোমীয়রা, হেরোদ এবং পীলাত খ্রীষ্টের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল। তারা তাঁকে আইনের দ্বারা দোষী সাব্যস্ত করেছিল। ক্রুশবিদ্ধ করেছিল, এবং তারা এক শতপতির মাধ্যমে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল। তারা তাঁর সমাধির কাছে প্রহরার জন্য সৈনিক নিযুক্ত করেছিল। দেখা যাচ্ছিল যেন তিনি চিরতরে পতিত হলেন, আর কখনও উঠে দাঁড়াতে পারবেন না। এই পুরুষটির থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরে তারা একত্রে উৎসব করেছিল এবং দম্ভভরে আনন্দ প্রকাশ করেছিল, যিনি তাদের ভণ্ডামিকে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন এবং তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভণ্ড সাজসজ্জাকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।

কিন্তু ধন্য সদাপ্রভু, “যাহা তিনি খ্রীষ্টে সাধন করিয়াছেন; ফলতঃ তিনি তাঁহাকে মৃতগণের মধ্য হইতে উঠাইয়াছেন, এবং স্বর্গীয়স্থানে নিজ দক্ষিণ পার্শ্বে বসাইয়াছেন, সমস্ত আধিপত্য, কর্তৃত্ব, পরাক্রম ও প্রভুত্বের উপরে, এবং যত নাম কেবল ইহযুগে নয়, কিন্তু পরযুগেও উল্লেখ করা যায়, তৎসমুদয়ের উপরে পদান্বিত করিলেন” (ইফিষীয় ১:২০–২১)। শয়তান ও তার দূতেরা তাদের জন্য নির্ধারিত যন্ত্রণার দিনের জন্য মুখিয়ে নেই।

৭০ খ্রীষ্টাব্দে ইহুদীরা সম্পূর্ণরূপে রোমীয়দের দ্বারা ধ্বংস হয়, এবং ৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দে রোমীয় সাম্রাজ্য গথদের (গথ; Goths– ছিলেন এক জাতিগোষ্ঠী, যাঁরা রোমীয় সাম্রাজ্যের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।) দ্বারা চূর্ণ হয়। হেরোদ ও পীলাতের দেহ মাটিতে পচে গেছে, আর তাদের আত্মা নরকে কষ্ট পাচ্ছে। তারা এক ভয়াবহ ও চিরস্থায়ী বিপদে পতিত হয়েছে, এবং মুক্তির কোনও পথ নেই। এবং একদিন তাদেরও হাঁটু গেড়ে স্বীকার করতে হবে—প্রভু যীশুই সর্বকালের প্রভু।

অতএব দুর্জনেরা সতর্ক হোন! ধার্মিকদের সঙ্গে শত্রুতা করার মূল্য হিসেবে নরক ভোগ করতেই হবে। যদিও ধার্মিক ব্যক্তি সময় সময়ে পতিত হয়, তবু স্বর্গের মহারাজা তাঁকে আবার তুলে ধরেন।

আর ধার্মিকরা আনন্দ করুন! দুঃখ বা পাপের পতনে হতাশ হবেন না। সদাপ্রভুর উপর বিশ্বাস রাখুন, কারণ নির্দিষ্ট সময়ে তিনিই আপনাকে আবার তুলবেন।

↑